চীনে উচ্চশিক্ষা

চীনে উচ্চশিক্ষা-স্কলারশিপ: এমবিবিএস, ইঞ্জিনিয়ারিং সহ সকল বিষয়ে পড়াশোনা

চীনে উচ্চশিক্ষা লাভের গুরুত্ব অপরিসীম। তথাপি এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশ চায়না । আন্তর্জাতিক ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক সংখ্যক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে চীনে। চীনা সরকার অন্যান্য দেশ থেকে আগত ছাত্র ছাত্রীদের জন্য সম্মানজনক বৃত্তি প্রদান করে থাকে। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক ছাত্র ছাত্র ছাত্রীদের বৃত্তির জন্য ৩০ কোটি ডলার এর সমতুল্য অর্থ প্রদান করা হয়। চায়নায় স্টুডেন্ট ভিসা প্রদানের হারও বেশী, ফলে শিক্ষার্থীদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়না।
চায়নায় ফুল কিংবা আংশিক স্কলারশিপ পাওয়া যায়। অথবা চাইলে নিজ খরচে পড়াশোনা করার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রেও খরচ কম।
নিচে ফুল স্কলারশিপ ও আংশিক স্কলারশিপসহ চায়নায় পড়াশোনার সকল বিষয় তুলে ধরা হল।

ফুল স্কলারশিপ:

চীনে ফুল স্কলারশিপ এমবিবিএস, ইঞ্জিনিয়ারিং সহ সকল প্রোগ্রামের ক্ষেতে প্রযোজ্য হতে পারে। এ স্কলারশিপের আওতায় যে সুবিধা গুলো পাওয়া যাবে সে গুলো নিচে দেওয়া হল-

  • টিউশন ফি ফ্রি।
  • হোস্টেল ফি ফ্রি।
  • প্রতি মাসে টাকায় ৫,০০০ থেকে ৪৫,০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃত্তির সুযোগ।

আংশিক স্কলারশিপ:

যেহেতু ফুল স্কলারশিপ রেজাল্টের ভিত্তিতে দেওয়া হয়; তাই সকলের জন্য এটি পাওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে কোন শিক্ষার্থী ফুল স্কলারশিপ না পেলে আংশিক স্কলারশিপের চেষ্টা করতে পারে। এ স্কলারশিপ সাধারণত এমবিবিএস, ইঞ্জিনিয়ারিং সহ সকল প্রোগ্রামের ক্ষেতে প্রযোজ্য।
নিচে আংশিক স্কলারশিপের সুবিধাসমূহ উল্লেখ করা হল-

  • টিউশন ফি হাফ ।
  • হোস্টেল ফি হাফ ।
  • মাসিক বৃত্তি নির্ভর করবে স্টুডেন্ট এর রেজাল্টের উপর।

প্রোগ্রাম সুমহ ও সময়

  • এমবিবিএস ৫ বছর।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাচেলর প্রোগ্রাম ৩-৪ বছর।
  • ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ৩-৪ বছর।

চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও পড়াশোনার মান:

চীনে প্রায় এক হাজারের উপর বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিছুদিন আগে একটা সংস্থা এক হাজার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা করে, তারমধ্যে এশিয়ার দেশ চীনের রয়েছে সর্বোচ্চ ৯২টি, ভারতের দুটি ও পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চীনের সব বিশ্ববিদ্যালয় ওভারসিজ স্টুডেন্ট বা বিদেশি শিক্ষার্থী নেয় না। আবার যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর সবকয়টিতে বাংলাদেশিদের জন্য সুযোগ নেই।

এমবিবিএস এর জন্য চীন কেন?

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিডিএমসি) অনুমোদিত ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে চীনে। কেউ চাইলে এর যে কোন একটিতে বিডিএমসি থেকে এলিজিবিলিটি সার্টিফিকেট নিয়ে ডাক্তারি পড়তে যেতে পারবে।

এখান থেকে এমবিবিএস শেষ করার পরে ইন্টার্নশিপ চাইলে দেশে এসেও করা যায়। আবার চাইলে নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও করা যায়। তবে হ্যাঁ, ইন্টার্নশিপ করার পর বিডিএমসি-তে একটি একশ মার্কসের সনদ পরীক্ষা দিতে হয়, সময় থাকে একশ মিনিট। এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যোগ্যতা বাংলাদেশের মেডিকেল এর মতোই। মানে নতুন নিয়ম অনুসারে এসএসসি ও এইচএসসি মিলিয়ে ৯ পয়েন্ট থাকতে হবে। সুতরাং এসএসসি ও এইচএসসি-তে খারাপ রেজাল্ট করে চীনে পড়তে গেলেও পাশ করার পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ডাক্তারির সনদ পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশীদের জন্য চীনে এমবিবিএস পড়াশোনার সুবিধা:

  • ভর্তি পরীক্ষা লাগে না।
  • IELTS করার প্রয়োজন নেই।
  • বাংলাদেশের মত একই পাঠ্যক্রমে পড়াশুনা করা যায়।
  • চায়নার ৫২ টি বিশ্ববিদ্যালয় বিএমডিসি (BMDC)- বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল অনুমোদিত।
  • চায়নার প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় WHO- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত।
  • সেখানে এমবিবিএস করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা যায়।
  • বিশ্বের স্বনামধন্য পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে চীনে।
  • লম্বা ভ্যাকেশন এ দেশে আসার সুযোগ রয়েছে।
  • নিরাপত্তা সুবিধা সংবলিত বিশাল ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে হোস্টেল সুবিধা ও খাওয়া-দাওয়া।
  • পড়াশুনার খরচ বাংলাদেশের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের চেয়েও কম।


কেন চায়নায় পড়াশোনা করবেন?

  • আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ল্যাব সুবিধা এবং অনেক বিষয়ে নিয়ে গবেষণারও সুযোগ রয়েছে এখানে।
  • আই ই এল টি এস অথবা টোফেল এর দরকার পড়ে না।
  • কোনো সেশনজট নেই। শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ। আছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা।
  • জীবনযাত্রার ব্যয় তেমন বেশি নয়। শহর ভেদে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে।
  • চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি পড়াশোনার বাইরেও চোখ খুলে দিবে।
  • অন্যদিকে চীনের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। তবে অনেকে সঠিক তথ্যের অভাবে হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন। তাই আমরা আপনাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে চাই।
  • কিছু স্কলারশিপ শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ খরচ অর্থাৎ টিউশন ফি থেকে শুরু করে বিনা মূল্যে আবাসন প্রদান করে। সঙ্গে দেয় নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক খরচ।
  • আর কিছু আছে শুধু টিউশন ফি স্কলারশিপ হিসেবে দেয়। আর যদি স্কলারশিপ নাও পান তবে নিজ খরচে পড়ার সুবিধাও রয়েছে এখানে।
  • চীনের স্কলারশিপগুলোর ফান্ড সরকার থেকে আসে সুতরাং আপনি একবার স্কলারশিপ পেলে মোটামুটি ৪ বছর নিশ্চিন্ত।
  • চীনের অধ্যাপকেরা অধিকাংশ খুবই আন্তরিক।
  • প্রত্যেক অধ্যাপকের নিজস্ব প্রজেক্টের ফান্ড থাকে। অনেকেই সেই ফান্ড থেকে তাঁর ছাত্রদের মাসিক বা বার্ষিকভাবে টাকা দিয়ে থাকেন।
  • চীনে মাস্টার্সের স্কলারশিপ পাওয়া বাকি দেশগুলোর তুলনায় অনেক সহজ। চীনে ফান্ডের অভাব নেই, মাস্টার্স এরপর পিএইচডি এর ভালো সুযোগ আছে।
  • প্রায় প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতে ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব আবাসিক এবং খাওয়াদাওয়ার জন্য মুসলিম ক্যানটিনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ট্যাগ: চায়না স্টুডেন্ট ভিসা, চায়না স্কলারশিপ

চীনে এমবিবিএস পড়াশোনার খরচ

এবার আসি খরচ ও পড়াশোনার মান নিয়ে। চীনে পড়াশোনা বিশ্বমানের হয় বলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবছর রেংকিং-এ ভাল অবস্থানে থাকে। ওভারসিজ স্টুডেন্টদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষক, প্রতিটা বিষয়ের জন্য আলাদা ল্যাব, কয়েক লাখ বইসমৃদ্ধ সুবিশাল লাইব্রেরি আর প্র্যাকটিসের জন্য রয়েছে হাসপাতাল। অবকাঠামোগত দিক থেকেও মান অনেক ভাল। অ্যানাটমি ল্যাবের পর্যাপ্ত ডেড বডি, পর্যাপ্ত অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং সার্বক্ষণিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ছাত্রদের পড়াশোনায় নতুন মাত্রা জুড়ে দেয়। হাসপাতালগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাজের ক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্যা হয় না। ওখানে ছাত্রদের ৪-৫ জনের ছোট ছোট গ্রুপ করে দেওয়া হয়। প্রতিটা গ্রুপকে সহযোগিতা করার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক বা সমন্বয়ক থাকেন। ভাষাগত সমস্যা তারাই সমাধান করে দেন। রোগীর সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে তারাই অনুবাদকের কাজ করেন।
চীনে মেডিকেল পড়ার জন্য টিউশন ফি, হোস্টেল ফি, থাকা খাওয়া সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে ন্যূনতম ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়। বলে রাখা ভাল, এখানে বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেলের মতো কোন এক্সট্রা হিডেন চার্জ বা ডোনেশন সিস্টেম নেই। টিউশন ফি প্রতি বছর একবার পে করতে হয়। তাই ফ্যামিলির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। চীনে পড়াশোনার জন্য আবেদন করা খুব সহজ। তবে সঠিক মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হবে।

এমবিবিএস এ স্কলারশিপ পাওয়া যায় কি?

চীনে এমবিবিএস বা বিডিএস এর জন্য সাধারণত কোন স্কলারশিপ পাওয়া যায় না। তবে পিজি বা পিএইচডি এসবের জন্য স্কলারশিপ পাওয়া যায়। ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষার্থীদের অবশ্য মেডিকেলের মতো কোন ঝামেলা নেই। তারা যে কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করলেই হবে। আর পড়াশোনা শেষ করে তারা বাংলাদেশ কিংবা পৃথিবীর যে কোন দেশে চাকরি করতে পারবেন। চীনে এমবিবিএস বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে কিন্তু কোন আইইএলটিএস বা টিওএফইএল লাগে না। তবে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের এখন অনেক ভাল ভাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ দেওয়া হয়। এসব স্কলারশিপ বিভিন্ন রকম। কোথাও শুধু টিউশন ফি ফ্রি, কোথাও হোস্টেল ফি ফ্রি, আবার কোথাও দুটোই ফ্রি। তারসাথে আবার মাসিক স্টাইপেন্ড বা ভাতাও দেয়া হয়।

চীনা ভাষা শিক্ষা

চীনা ভাষা নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু এটা মোটেও চিন্তার কোন ব্যাপার নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবাই ইংরেজিতেই কথা বলেন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমেই ক্লাস হয়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি ফ্রি চায়না ভাষার ক্লাসও অফার করে। ভালোভাবে পড়াশুনা করলে ছয় মাসেই চীনা ভাষা শেখা সম্ভব। চীনে বর্তমানে দুটো স্কলারশিপ চালু রয়েছে। একটা হলো সিএসসি স্কলারশিপ। এর আওতায় টিউশন ও হোস্টেল ফি ফ্রি। আর সাথে থাকে স্মাতক পাশ ছাত্রদের জন্য তিন হাজার ইউয়ান (প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ টাকা) এবং পিএইচডি ছাত্রদের জন্য তিন হাজার পাঁচশ ইউয়ান (প্রায় ৪৩ হাজার ৭৫০ টাকা) মাসিক স্টাইপেন্ড।
এই স্কলারশিপের জন্য বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন করা যায়। তবে চাইলে অধ্যাপকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেও আবেদন করা যায়। আরেকটি স্কলারশিপ হলো আইএসএসপি। এর আওতায়ও কিছু স্কলারশিপ পাওয়া যায়। কিন্তু এতে সাধারণত মাসিক স্টাইপেন্ড থাকে না।

সূত্র: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

আরও পড়ুন:


কোন পরামর্শ বা প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করতে পারেন বা খুব প্রয়োজনে মোবাইল করতে পারেন।
লেখক:আবু জাফর রাজু, পিএইচডি ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কনসালটেন্ট, বি.এম. এস.সি.এল
(বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্টুডেন্ট ভিসা সেন্টার)
মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ: +8801790550000 (সকাল ১০-রাত ৯টা)
বি:দ্র: লেখাটি কপি না করার জন্য অনুরোধ করছি, তবে লিংক প্রদান বা অনুমতি নিলে বৈধ হবে।
সর্বশেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *